সৌরজগতের প্রাণভোমরা হলো সূর্য। আকাশের বুকে জ্বলন্ত এক অগ্নিকুন্ড। বিপুল শক্তি, বিশাল আয়তন আর তীব্র গতি তাকে দিয়েছে দানবীয় মর্যাদা। অবিরাম ঘুরে চলেছে আপন অক্ষে-তাও সাড়ে ৪শ কোটি বছর হলো । ভয়ঙ্কর উত্তাপ ছড়ায় রাগী সূর্যটা অবিশ্রান্ত, ভীষণ আক্ৰোশে । সেই অগ্নিস্নানে পুড়ে পুড়ে প্রতি মূহুর্তে এগিয়ে চলেছে বিশাল একটি জগৎ বিকাশ আর সমৃদ্ধির একটি বিষয়কর সোপানে।সূর্য মানে জীবন ও সৃষ্টির উৎস। সূর্যহীনতায় এই সমৃদ্ধজগৎ পরিণত হবে মহাশশানে । মহাজগতের বিচারে হতে পারে সূর্য অতি তুচ্ছ একটি তারা। কিন্তু আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের বিবেচনায় সূর্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি তারকা। সৌরজগতের কর্তা এই সূর্য। পরম যত্নে সে আগলে রেখেছে তার সন্তানদের। সূর্যের বুকে প্রতিনিয়ত চলছে ভয়ঙ্কর তোলপাড়, ভীষণ অস্থিরতা।এই অস্থিরতার ধাক্কা এসে পড়ছে আমাদের পৃথিবীসমেত গোটা সৌরজগতে। গ্রীক কাহিনীতে সানকে বলা হয় হিলিওস। হিলিওস হলো সূর্যের দেবতা। রোমান কাহিনীতে তার নাম সোল। এই অধ্যায়ে সূর্য এবং তার সম্প্রতিক অবস্থা সম্পর্কে থাকলো জরুরি কিছু আলোচনা।সৌরজগৎ এবং সূর্যমহাজগতের বিবেচনায় সৌরজগতটি নেহাতই অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং অতি তুচ্ছ একটি অঞ্চল । বিশাল মহাসমুদ্রে এক বিন্দু পানি যেমন, সৌরজগতের অবস্থান তাই-ই। কিন্তু আমাদের নিজস্ব অবস্থান থেকে দেখলে সৌরজগত একটি বিরাট অঞ্চল । আর এই সৌরজগতের কেন্দ্র, কর্তা প্রাণভোমরা হলো সূর্য। জীবন ও সব ধরণের শক্তিরউৎস । সোলার সিস্টেমের কেন্দ্রে অবস্থান করে সূর্য নিয়ন্ত্রণ করছে সৌরজগতের সমস্ত সদস্যকে। এই সূর্যকে কেন্দ্র করে অনবরত প্রদক্ষিণ করে চলেছে ৯টি গ্রহ। এই ৯টি গ্রহের মধ্যে দু'টি বাদে বাকি ৭টির আবার রয়েছে এক থেকে একাধিক উপগ্রহ।সৌরজগতের মোট ভরের ৯৯.৮৫ শতাংশই সূর্যের। সূর্যের ভর হলো আমাদের পৃথিবীর ভরের ৩ লাখ ৩২ হাজার ৮শ' গুণ । আর সূর্যের ব্যাস হলো পৃথিবীর ব্যাসের ১০৯ গুণ। ঘনত্ব ১.৪১০ গ্রাম/ঘন সেন্টিমিটার। সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহটির নাম বুধ । এর পরেই শুক্র। আমাদের পৃথিবীর অবস্থান ৩ নম্বরে। পৃথিবীর রয়েছে একটি চাঁদ বা মুন। ৪ নম্বরে রয়েছে মঙ্গল গ্রহ। মঙ্গলের রয়েছে দুটি উপগ্রহ- ফোবোস ও দিমোস । এরপর সৌরজগতে সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহম্পতির অবস্থান। এই গ্রহ দানবের রয়েছে ১৬টি উপগ্রহ- মেতিস, অদ্রাস্তি, আমালথিয়া, থেবে, আইও, ইউরোপা, গ্যানিমিদ, ক্যালিস্টোলেদা, হিমালিয়া, লিসিথিয়া, ইলারা, আনাঙ্ক, কার্মে, প্যাসিফিয়া এবং সিনোপ। ৬ নম্বর অবস্থানে রয়েছে শনি গ্রহটি । এর রয়েছে বেশ কিছু উপগ্রহ। এর মধ্যে রয়েছে- প্যান, অ্যাটলাস, প্রমেথিউস, প্যান্ডোরা,এপিমেথিউস, জেনাস, মিমাস, এনসেলাডাস, টেথিস, টেলিস্টো, ক্যালিপসো, ডিওন, হেলেন, রিয়াটাইটান, হাইপেরিওন, ইয়াপেটাস ও ফোবে। সৌরজগতের ৭ম অবস্থানে আছে ইউরেনাস । ইউরেনাসের রয়েছে ১৮টি চাঁদ বা উপগ্রহ যেমন, কর্জেলিয়াওফেলিয়া, বিয়ানকা, ক্রেসিডা, ডেসডেমোনা, জুলিয়েট, পোর্শিয়া, রোসালিঙ, বেলিন্দাপুক, মিরিন্ডা, অ্যারিয়েল, অ্যাব্রিয়েল, টাইটানিয়া, ওবেরয়, ইউরেনাস-১৬, ইউরেনাস-১৭ এবং ইউরেনাস -১৮। ৮ম অবস্থানে আছে নেপচুন গ্রহটি। নেপচুনের রয়েছে ৮টি উপগ্রহ বা চাঁদ - নাইয়াদ, থালাসা, ডেসপিনা, গালাটিয়া, লারিসা, প্রোটিয়াস, ট্রাইটন ও নেরিদ। সৌরজগতের প্রান্তীয় গ্রহ প্লুটো । প্লুটোর একটিই চাদ- শ্যারণ ।সূর্য পরিবারগ্রহ ছাড়াও সৌরজগতে রয়েছে আরো অনেক বাসিন্দা। এরা হচ্ছে উষ্কা, গ্রহাণু এবং ধূমকেতু। এদের বলা হয়ে থাকে সৌরজগতের জঞ্জাল। সৌরজগতের দু'টি অঞ্চলে এদের বসবাস। একটি হলো মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের মধ্যবর্তীঅ্যাস্টরয়েড বা কুপার বেষ্ট । আরেকটি অঞ্চল হচ্ছে ওর্ট ক্লাউড অঞ্চল । সৌরজগতের একেবারে বাইরের এই হীম শীতল এবং ভয়ঙ্কর অন্ধকার অঞ্চলে বসবাস করে অসংখ্য গ্রহাণু এবং ধূমকেতু। এদের বলা হয় মহাকাশ জঞ্জাল। উল্লেখ্যযোগ্য কয়েকটি হলো, হ্যালীর ধূমকেতু, শূন্যমেকার-লেভী৯, হায়কুতাকা, ৯৫১ গাসপ্রা, ২৪৩ আইদা, ২৫৩ ম্যাথিল্ড ইত্যাদি । সৌরজগতের শেষ সীমানা বা বাউন্ডারি এলাকাকে বলা হয় হেলিওস্ফেয়ার। এই অঞ্চল পর্যন্ত পৌছে যায়বসৌর বাতাস বা প্লাজমা ঝড়। সূর্য থেকে এই সৌর বাউন্ডারির দূরত্ব ১শ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট বা জ্যোতির্বিদ্যা একক। কিলোমিটারের হিসেবে ১ হাজার ৪শ' কোটি কিলোমিটার। এই হলো আমাদের সৌরজগৎ।সৌর সম্রাটবিশাল এক জগতের কর্তা হলো সূর্য । আমাদের সূর্যিদেব একটি হলো সাধারণ জি - ২ ঘরানার তারা । আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ে বা ছায়াপথে রয়েছে ২০ হাজার কোটি তারা । সূর্য তাদের মধ্যে একটি এবং মধ্যম মান ও শক্তির তারা । সূর্যের ব্যাস ১৩ লাখ ৯০ হাজার কিলোমিটার । ভর ১ . ৯৮৯ x ১০^৩০ কেজি । সূর্য পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৫৮০০ ডিগ্রি কেলভিন , আর কোর বা কেন্দ্রাঞ্চলে এই তাপমাত্রা ১ কোটি ৫৬ লাখ কেলভিন । বিশাল সৌরজগতের মোট ভরের ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশের বেশি ভর হচ্ছে সূর্যের । বাকি অংশটুকুর বেশির ভাগই জুপিটার বা বৃহস্পতির দখলে । সূর্যের মোট ভরের ৭৫ শতাংশ হলো হাইড্রোজেন এবং বাকি ২৫ শতাংশ হিলিয়াম। সূর্যের মোট অণুর সংখ্যা হিসেব করলে এর ৯২ দশমিক ১ শতাংশ হলো হিলিয়াম । হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছাড়া আরেকটু ভারী পদার্থের পরিমাণ সূর্যে মাত্র দশমিক শতাংশ ।ঘুরছে সূর্যপৃথিবী সমেত সমস্ত গ্রহ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করলেও সূর্যও কিন্তু অবিরত মিল্কিওয়ের কেন্দ্রকে যেমন প্রদক্ষিণ করে চলেছে তেমনি নিজেও অনবরত নিজ অক্ষে লাটিমের মতো পাক খাচ্ছে । তবে মজার ব্যাপার হলো সূর্যের পুরো অংশটা এক সঙ্গে এক গতিতে ঘুরছে না । এর প্রধান কারণ সম্ভবত সূৰ্য কঠিন কোনো বস্তু নয় । এটি পুরোটাই একটি গ্যাসের পিণ্ড । সূর্যের নিরক্ষীয় বা বিষুবীয় অঞ্চলটি ২৫ দশমিক ৪ দিনে একপাক সম্পন্ন করে । অন্যদিকে মেরু অঞ্চল দুটো এক পাক শেষ করতে সময় নেয় ৩৬ দিন । এই একই ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা কিন্তু গ্যাসীয় গ্রহের ক্ষেত্রেও ঘটতে দেখা যায় যেমন বৃহস্পতি।
0 Comments