কথিত আছে, ৩০০ খৃষ্টাব্দে প্রাচীন গ্রীসদেশে ডেডিলাস নামে এক বিখ্যাত মিস্ত্রী ও তার ছেলে আইকারুস বাস করত। একদা একটি সফরকালে রাজা মুউনস তাদের দুজনকে বুদ্ধি করে জেলে প্রেরণ করেন।বিশাল সমুদ্রের উপর দিয়ে পালাবার পথ খুঁজতে খুঁজতে ডেডিলাসের মাথায় এক বুদ্ধি এল। Dedilas তার ও তার ছেলের জন্য মোম দিয়ে পাখা তৈরী করলো। এই পাখা দিয়ে ভূমি থেকে সিলিতে উড়ে যাবার ফন্ধি করলো ওরা। ডেডিলাস (Dedilas) নিরাপদে উড়ে সিসিলিতে অবতরণ করলো। কিন্তু আইকারুস (Al karros) উড়তে উড়তে সূর্যের এত কাছে গিয়ে পৌছেছিলো যে, সেখানে যাওয়ার পর পাখা ফেটে সূর্যের তাপে গলে গেল, আর সে নিপতিত হলো সাগরের বুকে। তবে এর কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ নেই।
এমনিভাবে ইটালীয় শিল্পী ও বিজ্ঞানি লিউনার্দো দ্যা ভিঞ্চি ১৫০০ সনে একটি চিত্র এঁকে উড়ার এক বিজ্ঞানভিত্তিক তাত্ত্বিক ধারণা দিয়েছিলেন। এর নাম ছিলো অরনিথপ্টার।
[caption width="300"]
E.P. Frost's 1902 ornithopter (Source : Wikipedia)[/caption]ওরনিথপ্টার হলো একটি আকাশযান যার পাখা ডানার অনুরূপ এবং পুরো ডানাদ্বয় উপরে নিচে উঠানামা করে এর বল ও থ্রাস্ট তৈরীর মাধ্যমে উডয়ন করে। কিন্তু তখনও উড়ার বৈজ্ঞানিক কৌশল জানা ছিলো না বলে মানুষ উড়তে পারেনি।
[caption width="725"]
Ornithopter[/caption]এমন ধারণা মাথায় রেখে অষ্টাদশ শতাব্দীতে মানুষ অন্য একধরনের জিনিষ তৈরীর চিন্তাভাবনা করতে লাগল। সে ঘুড়ির মতো কিছু একটা বানিয়ে তাতে করে আকাশে ঝাঁপ দিতে চেয়েছিলো। ইংরেজীতে গ্লাইড শব্দটি তোমরা নিশ্চয়ই শুনেছ। বাতাসের উধ্বচাপে এবং বাতাসের বেগে তাড়া খেয়ে উড়ে চলাকে গ্লাইড বলে । ঝড়ের সময় ঘরের চালের একখানা টিন বাতাসে অনেকদূর পর্যন্ত উড়ে চলে গেল।আসলে টিনখানি নিজের শক্তিতে উড়ে যায়নি। বাতাসের ঝাপটাবরয়েছে এর মূলে। আসলে টিনখানা অল্প যতটুকু সময়ের জন্য উড়েছিলো, ঠিক ততটা সময়ের জন্যই টিনখানাকে গ্লাইড করেছিলো। ঝড়ের মতো প্রচণ্ড বেগে বাতাস না বইলে টিন আকাশে উড়বে না। কিন্তু তার পরিবর্তে হালকা কিছু পদার্থ এবং তার সাথে প্লেনের ডানার মতো পাখা থাকলে বাতাসের অল্প বেগেও সেটা আকাশে উড়বে।
মানুষ আকাশে উড়বার আকাংখায় হাতের সঙ্গে পাখির পাখার মতো ডানা লাগিয়ে সেটা ঝাপটে পাখিদের সঙ্গে উড়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু মানুষের দেহখানা এত বেশি ভারী বলে পাখীর মতো ডানা ঝাপটা ঝাপটি করে তা দিয়ে পাখির মতো আকাশে উড়া সম্ভব নয়। আর সেটা সম্ভব নয় বুঝতে পেরে সে তার নিজের শক্তির পরিবর্তে বাতাসের শক্তির উপর ভর করল। দেখা গেলো ঝড়ো বাতাসের সময় বড় আকারের ঘুড়ি, ছাতা এসব ধরে থাকলে ওগুলো সমেত বাতাস মানুষকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায় বা উড়িয়ে নিয়ে যায়। ফলে মানুষ বুঝতে পারল, সুন্দরভাবে যদি ঘুড়ির ডিজাইন করা যায়, তবে তার নিচে ঝুলে থেকে অল্প সময়ের জন্য হলেও আকাশে উড়া সম্ভব । এছাড়াও মানুষ দেখতে পেল , পাখি শুধু ডানা ঝাপটেই আকাশে উড়ে না । অনেক সময় পাখি তার ডানার ঝাপটা বন্ধ রেখে কেবল সেটা মেলে দিয়েই বাতাসের উপর ভর করে আকাশে ভেসে বেড়ায় ।
ঘুড়ি উড়ানোর কৌশল এবং পাখির আকাশে উড়ার কৌশলই গ্লাইডার এবং এরোপ্লেন আবিষ্কারে মানুষকে বেশি সাহায্য করে। মহান চিত্রকর এবং বৈজ্ঞানিক লিউনার্দ দ্যা ভিঞ্চি পাখীর আকাশে উড়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও অংকনসহ "সুল ভোলো দেলি -সেলিল” নামে একটি বই লিখে রেখে যান। এর পর কাউন্ট ফার্দিনান্ড চার্লস ফিলিস নামের একজন ফরাসী ভদ্রলোক ১৮৬০ সালে পাখিদের আকাশে উড়ার কৌশল সম্পর্কে আর একটি বই প্রকাশ করেন।
[caption width="739"]
Leonardo Da Vinci (Source - https://mos.org[/caption]পাখি সম্পর্কে সব থেকে তথ্য নির্ভর এবং বিস্তারিত বিবরণসহ বই লিখেছিলেন জার্মানীর অটো লিলিয়ানথল। তিনি গভীর পর্যবেক্ষণের সাথে পাখিদের আকাশে উড়ার কৌশল আর তাদের ডানার আকৃতি ও গঠন পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি খেয়াল করলেন শরীরের তুলনায় বড় ডানাওয়ালা পাখি আকাশে ওড়তে পারে অনেক বেশি পথ। বিপরীতে একটি ভারী ছোট পাখাওয়ালা বা ডানাওয়ালা পাখী ওড়তে পারে দ্রুত। তিনি আরও খেয়াল করলেন মানুষ সাঁতার কাটার সময় যেভাবে পানি পিছনের দিকে ঠেলে দিতে দিতে এগিয়ে যায়, পাখিও যেভাবে পাখার সাহায্যে বাতাস পিছনের দিকে ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। তিনি পাখীদের আকাশে ওড়বার ব্যাপারে যে বিখ্যাত বইটি লেখেন সে বইটির নাম ‘ফোগেল ফলুগ'। বাংলা করলে দাড়ায় ‘পাখী ওড়ে আকাশে'।

পাখিদের আকাশে ওড়ার এ কৌশলকে ভিত্তি করেই অটো লিলিয়ানথল একদিন বিরাট একটা গ্লাইডার বানিয়ে সেটা পরীক্ষা নিরিক্ষা শুরু করে দিলেন। অন্যদের সঙ্গে তার পার্থক্য এখানেই যে, তিনি নিজে পাখির মতো ওড়তে চেষ্টা না করে পাখির মতো করে গ্লাইডার তৈরী করে ফেলেন। তার চিন্তা ছিলো, এর সাহায্যে আকাশে ওড়া যাবে। তার এ ভাবনাই ছিলো আকাশে ওড়ার সঠিক পথ ।
হের অটো লিলিয়ানথল ১৮৪৮ সালে জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আর্মস্টার্ডাম ও বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনি উড়ার কৌশল বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করেন। অসম্ভব প্রতিভাবান ছাত্র ছিলেন তিনি। ছোট বেলা থেকেই দেখতেন আকাশে ওড়ার স্বপ্ন। ১৮৬৯ সালে তার ভাইয়ের সঙ্গে মিলে মিশে ওরনিথস্টার বানিয়ে পাখির মতো ওড়ার চিন্তা শুরু করেন। এ ঘটনার কিছুদিন পরেই ফ্রান্সের সঙ্গে জার্মানির যুদ্ধ। বাধে । ফলে লিলিয়ানথলকে যোগ দিতে হয় যুদ্ধে। ১৮৭১ সালে যুদ্ধ শেষে সৈনিকের পোশাক ছেড়ে গ্রহণ করলেন তার পছন্দ মতো ইঞ্জিনের ব্যবসা। এমনি করেই একদিন লিলিয়ানথল পাখির আকাশে ওড়ার কৌশলের অনুকরণে বানিয়ে ফেললেন গ্লাইডার।
[caption width="300"]
Glider Airplane (Source - Wikipedia) [/caption]তারপর সেটা শরীরের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে একটা উচু জায়গা থেকে ঝাঁপ দিয়ে বাতাসের সাহায্যে আকাশে ভাসতে সক্ষম হলেন। নিজের প্রাথমিক সাফলে সে কি আনন্দ তার ! ফলে আরও উন্নত মানের গ্লাইডার তৈরী করলেন। তিনি বার বার গ্লাইডার নিয়ে উচু জায়গা থেকে ঝাঁপ দিয়ে উড়তে গিয়ে যন্ত্রটিকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তারও কলাকৌশল উদ্ভাবন করার চেষ্টা করতে লাগলেন তিনি।
বাকী অংশ আগামী পর্বে ............
মূল - বিমান তৈরি সহজ কত - সফিকুল আলম


1 Comments
[…] ১ম পর্ব পড়ুন – বিমান তৈরীর আদি কথা | পর্ব – ১ […]
ReplyDelete