মধ্য ডিসেম্বরের রাত । ঘড়ির কাটা দশটার ঘর পেরিয়েছে অনেক আগেই। বনে আছি শ্রীমঙ্গলের নির্জন নিস্তব্ধ চা বাগানের একটি ছোট টিলার ওপরে । বাগানের নাম কুরমা। শ্রীমঙ্গল শহর ছেড়ে গাড়িতে দু'আড়াই ঘন্টার পথ কমলগঞ্জ । বাগানটির অবস্থান সেখানেই। পথের বেশির ভাগটাই কাঁচা, এবড়ো-থেবড়ো। পথের দু’ধারে ফসলি জমি আর ঝোপ- ঝাড়। বেশ দূরে দূরে ছোট ছোট জনবসতি । ১০/২০ ঘরের বসতি, দু'চারটি মুদি দোকান ব্যাস । কুরমায় আসতে হলে, পেরুতে হয় একটি বিডিআর চেক পোষ্ট। কারণ চা-বাগানটি একেবারে ভারত সীমান্ত লাগোয়া।
পথ চলার সমস্ত ধকল, কষ্ট এক লহমায় উধাও হয়ে যাবে কুরমার প্রশান্ত পরিবেশে পৌছাতেই। ভীষণ নির্জন পরিবেশ। অমাবস্যার গাঢ় তান্ধকারের মতো জমাট নিস্তব্ধতা গ্রাস করে নেয় মুহুর্তেই। আশে পাশে জনবসতি তেমন নেই। বাগানের একপাশে শ্রমিকদের কোয়াটার আর কারখানা। আরেক পাশে অফিসার্স কোয়াটার । ম্যানেজারের বাংলোটি একটি অনুচ্চ টিলার ওপর । বাগানের মাঝামাঝি আরেকটি বাংলো আছে। সেখানে থাকেন এাসিস্টেন্ট ম্যানেজার। সে সঙ্গে বাংলোটি গেস্ট হাউজ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বেশ উচু একটি টিলার ওপর এই কাঠের বাংলোটি । বাংলোর সামনের এক চিলতে লনে গিয়ে দাড়ালে আশে পাশের অনেকটা অংশ নজরে আসে। একের পর এক ঢেউ খেলানো টিলার গায়ে সবুজ গালিচার মতো চা বাগান, ইতস্তত শেড ট্রি। আরো দূরে অযত্বে অবহেলায় বড় হয়ে ওঠা ঝোপ- ঝাড়। ঝোপ- জঙ্গলের ওপারে গভীর অরণ্যের আভাস। শহর ছেড়ে অনেক দূরে অবস্থানের কারণেই সম্ভবত চা বাগানটি কিছুটা জংলা ধরনের।
পাহাড়ী এলাকার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট আছে। সূর্য পশ্চিম দিগন্তে গিয়ে হাজির হতেই প্রকৃতি সাজতে শুরু করে আপন খেয়ালে । দিন শেষের বয়সী রোদ তার গাছ গাছালির মাথা ছুয়ে যখন গলে গলে নামতে থাকে মাটির ওপরে, তখন থেকেই রহস্যময়ী হয়ে ওঠে পাহাড়ী এলাকা । সূর্য ডোবার আগে থেকেই পাহাড়ী ঝোপ- ঝাড়ে জমতে থাকে থোকা থোকা অন্ধকার । আকাশ থেকে আঁধার নেমে আসার আগেই চরাচর জুড়ে অকাল সন্ধ্যা । ঘড়ির কাঁটা আটটার ঘর পেরুতেই আততায়ীর মতো ঝাঁপিয়ে নামলো শীত । প্রতিরোধক নানা বর্ম ফুড়ে হিমের আগ্রাসনে অস্থিমজ্জা পর্যন্ত অসাড় হবার যোগার । তবুও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার দুর্নিবার আকাংখায় বাংলো লাগোয়া আরেকটি টিলার মাথায় গিয়ে চড়ে বসি । না, সেই হিমের রাতে জোয়ার অকৃপণ নৈবদ্য মোটেও জোটেনি কপালে।গলে পড়া জোয়ার মোলায়েম আলোর কারসাজিতে প্রকৃতির বারবার রূপ বদলের দৃশ্য-সে এক বিরল অভিজ্ঞতা । জোৎস্না রাতে বুনো আর নির্জন চরাচর যেনো ইন্দ্ৰলোক, আফ্রোদিতির সংসার। রহস্যময় গা ছমছমে অপার্থিব সে পরিবেশ।
না- এমন অমল ধবল জোৎস্না রাতের বাকৰুদ্ধ করা অভিজ্ঞতা অর্জনের সৌভাগ্য সে রাতে জোটেনি ডিসেম্বরের সেই রাতটি ছিলো ঘোর অমাবস্যার। চারদিকে গাঢ় অন্ধকারের রাজত্ব। বিকেল গড়াতেই যেখানে ঝোপ- ঝাড়ের নিচে জমতে থাকে অন্ধকার, রাত ১০টায় সেখানে শুধুই কালোর আগ্রাসন । দৃষ্টি চলেনা দু'হাত দূরেও। নিকশ কালো অন্ধকারে ডুবে থাকা চরাচরে ভুতুরে পরিবেশ। ইতস্তত ছড়ানো ছিটানো শেড ট্রিগুলো স্থির, নিশ্চল । পুরো জগতটিই যেনো প্রেতপুরি । জীবনের কোনো অস্তিত্ব নেই যেনো। কিন্তু মাথার ওপরে ভেলভেট কালো আকাশের বুকে তখন অন্য এক আয়োজন । অজস্র তারায় সাজানো এক সংসার। চট করে মনে জাগে প্রশ্ন, রাজধানীর আকাশে কোথায় হারায় তারারা? মৃত্যুপুরি জগৎ সংসারের তুলনায় আকাশটাকেই অনেক বেশি জীবন্ত মনে হয়। বিপুল তারার ভিড়ে খুঁজে নিতে কষ্ট হয় মাথার ওপরে অবস্থান নেয়া কালপুরুষ নীহারিকাটিকেও। দূরে দিগন্তের কাছে সপ্তর্ষিমন্ডলও অজস্র তারার ভিড়ে একাকার। আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ে বা ছায়াপথের উজ্জ্বল আলোর ফিতাটাও স্পষ্ট । উত্তর থেকে দক্ষিণে মাঝ আকাশের বুক চিরে বয়ে গেছে আলোর পথটি কোন স্বগালোকের পানে কে জানে । ওই নিস্তব্ধতায় অমাবস্যার হিম রাতে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে মনের ভেতরে মাথা তোলে এক অপৰ্থিব অনুভুতি । আপাত শান্ত তারায় তারায় সয়লাব ওই আকাশে প্রতি নিয়ত ঘটে চলেছে কি ভীষণ তোলপাড়, তার খবর কতটাই বা জানি আমরা। দুরন্ত গতি, অকল্পনীয় উত্তাপে ছাড়খার হচ্ছে পুরো মহাজগৎ। অবিরাম সৃষ্টি আর ধ্বংসের মরণ খেলায় মেতে রয়েছে এই মহাজগৎ প্রতিমুহুর্ত খেলার শুরু হয়েছে আজ থেকে ১২শ' কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং নামে এক মহাবিস্ফোরণে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হবার পর থেকে।
ছোট বেলায় স্কুলে পৃথিবী বিষয়ে পড়ানোর সময় স্যার যেদিন বললেন, আমরা এখানে বসে রাতের আকাশে গ্রহ তারাদের যে ভিড় দেখি, তেমনি প্রতিবেশী মঙ্গলগ্রহ থেকে পৃথিবীকেও ছোট্ট একটি তারার মতো দেখাবে। স্যারের এই কথাটি শুনে সেদিন ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। তবে কেনো মনে হয় আমাদের পৃথিবীটিই মহাবিশ্বের প্রাণকেন্দ্র। আর সবকিছুই তাকে কেন্দ্র করে ঘুরে চলেছে। অবিরত। যেমন চাদ- সূর্য ঘুরে চলেছে। অদিম মানুষও এমনই মনে করতো। এমন কি সক্রেটিস পর্যন্ত বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীই গোটা মহাবিশ্বের কেন্দ্র। আর সবকিছুই তাকে কেন্দ্র করে ঘুরে চলেছে। রহস্যটা বুঝে উঠতে না পারলেও মহাবিশ্ব নিয়ে মানুষের কৌতুহল হাজার বছরের । এইতো ১৬ শতকের আগেও মানুষের বিশ্বাস ছিলো সূর্যসহ অন্যান্য গ্রহ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে আর মানুষের এই বিশ্বাসের মূলে রয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমি । খ্রীস্টপূর্ব ১৫০ সালে গ্রীস জ্যোতির্বিদ টলেমি বলেছিলেন , মহাবিশ্ব হলো পৃথিবী কেন্দ্রিক । এর বহু বছর পর পোলিশ জ্যোতির্বিদ নিকোলাস কোপার্নিকাস (১৪৭৩ - ১৫৪৩) গ্রহগুলোর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে জানালেন টলেমির দাবি সঠিক । ১৫৪৩ সালে লেখা ‘ দি রেভল্যুশন অব দ্য হেভনলি অরবস ’ বই এ কোপার্নিকাস ঘোষণা করলেন , ‘ পৃথিবী মহাজগতের কেন্দ্র নয় এবং অন্যান্য গ্রহের মতোই পৃথিবীও সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে । এ কারণেই সোলার সিস্টেম বা সৌরজগতের মডেলকে কোপার্নিকাস সিস্টেম বলা হয়ে থাকে । টেলিস্কোপ বা দুরবিন আবিষ্কারের আগে ডেনিস জ্যোতির্বিজ্ঞানী টাইকো ব্রাহে ( ১৫৪৬ - ১৬০১ ) আরো সূক্ষভাবে গ্রহগুলোর কক্ষপথ ও তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং টলেমির তত্ত্বের ভুলত্রুটিগুলো সংশোধন করেন । টাইকো ব্রাহেই প্রথম ইউরোপে একটি অবজারভেটরি বা মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন । এরপর জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার ( ১৫৭১ - ১৬৩০ ) জানালেন , গ্রহদের গতিপথ উপবৃত্তাকার । এছাড়াও তিনি ঘোষণা করলেন , সূর্যের কাছাকাছি পৌছলে গ্রহদের গতি বেড়ে যায় আর গ্রহের আকার যতো বড় হবে তাদের সৌর প্রদক্ষিণের সময়ও ততো বেড়ে যাবে । এরপর আসলেন ইতালীর জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি ( ১৫৬৪ - ১৬৪২ ) । টেলিস্কোপ আবিস্কারের কৃতিত্ব । তাকেই হয় । কিন্তু আসলে বিশ্বের সর্বপ্রথম টেলিস্কোপটি তৈরি করেছিলেন একজন ডাচ অপটিসিয়ান ১৬০৯ সালে ।
চলবে .........
মূল - (সৌরজগৎ - চৌধুরী আফতাবুল ইসলাম)


0 Comments