১ম পর্বের পর ....... শেষ পর্ব

১ম পর্ব পড়ুন - বিমান তৈরীর আদি কথা | পর্ব – ১

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লিলিয়ানথল এক এক করে তৈরী করেছিলেন মােট ১৭ টা গ্লাইডার। তৈরী করতেন আর সেগুলাে আকাশে ওড়ায়ে নানাভাবে তার উপযােগিতা পরীক্ষা করে দেখতেন। দেখতেন কি কি অসুবিধা আছে তার, কিভাবে ওপরে উঠতে বা নিচে নামতে হবে, কিভাবে ঝড়াে বাতাসের সময় ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে এসব।

[caption width="216"]Otto lilienthal (source-wikipedia)[/caption]

লিলিয়ানথল তার প্রতিবারের আকাশে ওড়ার অভিজ্ঞতার ফলাফল বিশ্লেষণ করে ভাল করে তা লিখে রাখতেন। গ্লাইডার নিয়ে তিনি মােট আড়াই হাজার বার আকাশে ওড়াউড়ি করেন। ফলে অর্জন করেন প্রচুর অভিজ্ঞতা। শেষে এসব অভিজ্ঞতা আর অংক শাস্ত্রে হিসাব-নিকাশের সাহায্যে তিনি বুঝতে পারলেন, কতখানি ওজনের বস্তু মাটি থেকে উপরে তুলতে হলে কতখানি আয়তনের ডানার প্রয়ােজন। প্রয়ােজন কত অশ্ব শক্তির ইঞ্জিনের।আরও যে তথ্য পেলেন তা হলাে তাকে তৈরী হয়েই আকাশে ওড়তে হবে অর্থাৎ তাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এলিভেটর, রাডার, রাডারফিন ওসবে প্রয়ােজন, সেটাও তিনি বুঝতে পারলেন। ফলে কিছুদিনের মধ্যে তিনি এক এক করে তার গ্লাইডার সংযােজন করেন। লিলিয়ানথল মারা যাবার এক বছর আগে অর্থাৎ ১৮৯৭ সালে এরােপ্লেনের কৌশল সিস্টেমের উপর তার লেখা একটি বই প্রকাশিত হয়। ১৮৯০ সালে হাফটোন ছাপার অক্ষর আবিষ্কৃত হয়। এর আগে ১৮৭১ সালে ম্রডক্ল নামের ভদ্রলােক চলন্ত বস্তুর ছবি তােলার মতাে ক্যামেরা আবিষ্কার করেন। আর এর কল্যাণে লিলিয়ানথলের আকাশে উড়বার যাবতীয় খবর ছবিসহ ছাপার অক্ষর পৃথিবীর দেশে দেশে প্রকাশিত হয়।

অটো লিলিয়ানথল অবশ্য তার ১৬ ও ১৭তম গ্লাইডার ইঞ্জিন লাগিয়ে ওড়ার পরিকল্পনা করেন। ১৮৮৫ সালে জার্মান বৈজ্ঞানিক মি. বেনজ পেট্রোল ইঞ্জিন আবিষ্কার করেন।

[caption width="590"]Founder of petrol engine Karl Benz (source - wikipedia)[/caption]

ইঞ্জিন আবিস্কৃত না হলে এরােপ্লেন তৈরি করা সম্ভব হত কিনা সন্দেহ। এর আগে রাশিয়ার বৈজ্ঞানিক মােহাহাসিক এবং কয়েকজন ফরাসী বৈজ্ঞানিক স্টিম ইজ্ঞিনের সাহায্যে এরােপ্লেন নিয়ে ওড়তে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। স্টিম ইঞ্জিনের শক্তি ওজনের তুলনায় ছিলাে অনেক কম। অথচ এরােপ্লেন নিয়ে ওড়তে হলে প্রয়ােজন অল্প ওজনের বেশি শক্তিশালী ইঞ্জিন। লিলিয়ানথলের সময় পেট্রোল ইঞ্জিনগুলাে আকারে ছােট আর শক্তি সম্পন্ন হলেও প্লেন ওড়াবার মতাে তেমন কার্যকর ছিলাে না। অবশ্য একথা তিনি জানতেন। তাই তার সর্বশেষ গ্লাইডার মডেলের একটা ছােট কারবনিক এসিড ইঞ্জিন সংযােজন করা হয়। ধারণা করেছিলেন তিনি গ্লাইডার করে আকাশে উড়ে বাতাসের বেগ, উর্ধ্বচাপ আর ছােট সেই ইঞ্জিনের সাহায্যে অনেক বেশি সময় ধরে আকাশে ভেসে বেড়াবেন। গ্লাইডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার ও উন্নতি করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে পারবেন। আর এভাবেই তিনি সক্ষম হবেন সত্যিকারের এরােপ্লেন তৈরী করতে। লিলিয়ানথলের সবচেয়ে প্রিয় ছিলাে তার ১১ নম্বর গ্লাইডার । ওটায় চড়ে তিনি আকাশে ১১৫০ ফুট দুরত্ব অতিক্রম করেছিলেন। ১৮৯৬ সালের ৯ আগস্ট তিনি তার পরিবাহন নিয়ে আকাশে ওড়েন। হঠাৎ করে দমকা বাতাসের একটা ঝাপটা গ্লাইডারের লেজের দিককে অনেকখানি ওপরে তুলে ফেলে। তিনি যতটা সম্ভব লেজের দিকে সরে এসে চেষ্টা করলেন তাল সামলাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলেন না। গ্লাইডারের ডান দিকটা কাত হয়ে গেল। আর কাত হতেই ৬৫ ফুট ওপর থেকে তার প্রিয় গ্লাইডারখানা খাবি খেয়ে পড়ে গেল মাটিতে। ওপর থেকে পড়ে যাওয়ায় তার মেরুদন্ড ভেঙ্গে যায়। একদিন পরে তিনি মারা যান। অটো লিলিয়ানথল প্রায়ই বলতেন ‘ওফের মুসেন গােবরাখট ভেরডেন'। অর্থাৎ আত্মহুতি ছাড়া বড় কিছু অর্জন করা যায় না। আর একথাগুলােই তার কবরের পাথরের ফলকে উকীর্ণ করে দেওয়া হয়।

[caption width="1536"]Otto lilienthal's Grave (source-wikipedia)[/caption]

এই অদম্য জার্মান বৈমানিকের শিষ্য পার্সিপিসারও এমনি এক দুর্ঘটনায় মারা যান। ১৮৮৬ সালে ব্রিটিশ বৈমানিক জর্জ কেইলি লিখেছিলেন আকাশে ওড়তে হল অনেককেই প্রাণ উৎসর্গ করতে হবে। মানুষের আকাশে ওড়বার সংকল্প বাস্তবায়িত করতে গিয়ে হের অটো লিলিয়ানথল, পার্সিপিসার এবং আরাে অনেকে তাদের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। বিমান আকাশে উড়ে একথা যেমন সত্যি, তেমনি পরিকল্পনাকে কাজে লাগিয়েই বিমান আকাশে উড়ে একথাও সত্যি। আমরা জানি, পৃথিবীর উপরিভাগে আছে বায়ুমণ্ডল। এ বায়ুমণ্ডল প্রায় ৪০০ মাইল পর্যন্ত উপরের দিকে বিস্মৃত। এ বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব আবার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের। পৃথিবীর ঠিক উপরি ভাগের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। অতএব যত উপরের দিকে উঠা যায় ততই এর ঘনত্ব কমে আসতে থাকে। এ ঘনত্বের তারতম্য এতাে বেশি যে একে কাজে লাগিয়ে মানুষ বিমানের এমন কিছু যন্ত্রাংশ তৈরি করেছে যা দিয়ে তারা অনায়াসে আকাশে উড়তে পারে।আবার বাতাসকে ভর করে বিমান আকাশে উড়ে। বাতাসই বিমানকে আকাশে ঠেলে উপরে উঠাতে সাহায্য করে। বিমান যখন আকাশে ভেসে বেড়ায় তখন কিন্তু বাতাস কেটে কেটে বিমান সামনে এগিয়ে চলে।

বিমান তৈরীর ব্যাপারে সবচেয়ে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখেন রাইট ভাতৃদ্বয়। তারা মূলত বিমান আবিষ্কারক। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য আজ বিমানের এত অগ্রগতি ।

[caption width="429"]Wright brothers (soure - wikipedia)[/caption]

১৮৬৭ সালে আমেরিকার ওহাইও রাজ্যের ভেঁন শহরে জন্ম গ্রহণ করেন উইলবার রাইট। এর চার বছর পর ১৮৭১ সালে জন্ম হয় অরভিল রাইট। তাদের ছিলাে ছাপাখানা। কিন্তু তা বিক্রী করে তারা বাইসাইকেল মেরামতের দোকান খুলে বসল।

১৮৯৬ সালে অটো লিলিয়ানথল গ্লাইডার চেপে উড়ে উড়ন্ত বস্তুর ওপর বাতাসের চাপ আর তার প্রবাহের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পরীক্ষা চালাতে গিয়ে মারা গেলে দুনিয়া জুড়ে এই দুর্ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়। তখন সে আকাশে উড়ার জন্য যে প্রচেষ্টা করেছিলাে তা জেনে ভাতৃদ্বয় মুগ্ধ হলেন।

দুর্ঘটনার পর অটো লিলিয়ানথলের কাজ যেখানে এসে থেমে গিয়েছিলাে সেখান থেকে ভাতৃদ্বয় কাজ শুরু করলেন। তারা ১৮৯৬ সালে কাজ শুরু করে এবং ১৮৯৯ সালে উড্ডয়নক্ষম গ্লাইডার তৈরী করতে সক্ষম হলেন। এরপর তারা এই গ্লাইডার উড়াবার জায়গা খুঁজতে লাগলেন।কারণ তাকে আকাশে উড়াতে হলে বাতাসের বেগ প্রয়ােজন। এজন্য তারা একটা স্থান পেলেন তার নাম কিটিহক। এটা ক্যারােলিনা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত। ১৯০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তারা গ্লাইডার ‘সামার ওয়ান' নিয়ে কিটিহকে আসেন।তাদের গ্লাইডারের ডানার দৈর্ঘ্য ছিলাে ১৭ ফুট, আর আয়তন ছিলাে ১৬৫ স্কয়ার ফুট। এতে লেজ ছিলাে না। এর এলিভেটর ছিলাে সামনের দিকে। এসময় বাতাসের জোর ছিলাে না বলে তারা উড়াউড়িতে সুবিধা করতে পারল না।তারপর ডেটনে ফিরে এসে তারা ‘ফলায়ান সামার টু' বানালেন। এটাও লেজবিহীন। এবারও কিটিহকে এসে পরীক্ষা চালালেন। এবার তারা নতুন ধরনের গ্লাইডার তৈরী করলেন। এবার তারা টেইলফিন ও লেজ সংযােজন করলেন।অবশেষে ১৯০৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর উইলবার এবং অরভিল তাদের 'ফলােয়ার ওয়ান’ নিয়ে আকাশে উড়ার জন্য তৈরী হলেন।

এরােপ্লেনের ওজন পাইলটকে নিয়ে ৩৩৮ কেজি। মাত্র একজন পাইলট বহন করার ক্ষমতা থাকায় দুভাইয়ের মধ্যে টস করা হলাে কে আগে আকাশে উড়বে । জিতে বড়ভাই উইলবার বিমানে চড়ে বসলেন। সামনের দিক থেকে ঘন্টায় বিশ থেকে বাইশ মাইল বেগে বাতাস বইছিলাে। বিমানের নিজের গতির কারণে এবং সম্মুখের বাতাসের চাপে ‘ফলায়ার ওয়ান’ মাটির স্পর্শ ছেড়ে প্রায় পুরােপুরি ওপরে উঠে যায় ।

[caption width="639"]first plane flight[/caption]

কিন্তু বিমান চালনার অদক্ষতার জন্য উইলবার এলিভেটর এতােটা বেশি বাঁকিয়ে দিলেন যে, আকাশে আর না উঠে সেটা ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। এতে তারা বরং খুশি হলেন এইভেবে যে, তাদের তৈরী ‘ফলায়ার ওয়ান’ আকাশে উড়তে সক্ষম। অতঃপর তারা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে বিমানখানা ঠিক করে ফেললেন। এবার তাদের বিমান ওড়াবার সাথী হিসেবে তারা ৫ জন কে সাথে রাখলেন। ১৭ ডিসেম্বর সকাল বেলা বাতাসের বেগ ২৫-২৭ মাইল। এ তারিখে ওড়বার পালা পড়ল ছােট ভাই অরভিলের। ঠিক সকাল সাড়ে দশটায় অরভিল রাইট বিমানে চড়ে বসলেন। তিনি ইঞ্জিন চালু করলেন। অতপর মাটির ওপর দিয়ে চল্লিশ মাইল বেগে। চলার পর বিমানখানা আকাশে উড়ল। অরভিল রাইট এগারাে সেকেন্ড ধরে আকাশ
পথে ১২০ ফুট উড়ার পর তার বিমানটি অবতরণ করলাে। মাটিতে নেমেই দ্রত ছুটে এসে উইলবারকে বুকে জড়িয়ে ধরে খুশিতে কেঁদে ফেললেন। এমনিভাবে সূচনা হলাে মানুষের আকাশ জয়ের সেই অভাবনীয় ইতিহাস।

খুশির আবেগে উইলবার এবার ওড়বার চেষ্টা করলেন। তিনি ১৫ সেকেন্ড ওড়ে ১৫৭ ফুট দূরত্ব অতিক্রম করলেন। এভাবে তারা সেদিন চারবার আকাশে ওড়লেন। শেষবার অরভিল ৫৯ সেকেন্ডে ৮৫২ ফুট অতিক্রম করলেন। বিমান নিয়ে মানুষের আকাশে ওড়বার এটাই হলাে প্রথম ঘটনা। এরপর প্রথম মহাযুদ্ধে বিমান তৈরীর প্রভুত উন্নতি সাধিত হয়।

[caption width="300"]Plane used in 1st world war[/caption]

প্রথমে বিমান সামরিক গােয়েন্দা হিসাবে ব্যবহার করা হত।পরবর্তীতে এগুলােকে বােমা নিক্ষেপ ও শত্রু বিমান গুলি করে ভূপাতিত করার কাজে ব্যবহৃত হত। বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকে ব্রিটেনের ৪৮, বেলজিয়ামের ২৪, ফ্রান্সের ১৩৪ ও জার্মানীর ১৮০টি জঙ্গি বিমান ছিলাে। অথচ এযুদ্ধে শুধু ব্রিটেন-৫৫,০০০টি বিমান তৈরী করে। বাকী দেশগুলােও অসংখ্য যুদ্ধ বিমান তৈরী করেছিলাে।

১ম বিশ্ব যুদ্ধের পর যুদ্ধ বিমানগুলাের প্রয়ােজন আর থাকল না। তখন সেগুলােকে যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার করা শুরু হলাে। এভাবে প্রথম যাত্রীবাহী ফ্লাইট
বের হয় এক ইঞ্জিন বিশিষ্ট ডি-এইচ ৪ বােমারু বিমান দিয়ে। এটা লন্ডন থেকে প্যারিস গমন করে। প্রথম যাত্রীবাহী বাণিজ্যিক এয়ারলাইনস্ এর নাম RDA
(Royal Dutch Airlines)|- এয়ারলাইনসে প্রথম ফ্লাইটটিতে যাত্রী ছিলাে মাত্র তিনজন। আর উড়ােজাহাজটির নাম ছিলাে ডি-এইচ ৯।

[caption width="640"]DH9 First plane used for Passengers (source - wikipedia)[/caption]

যা আর্মস্টার্ডাম থেকে লন্ডন গিয়েছিলাে। তখন উড়ােজাহাজ ছিলাে খােলা। যাত্রীদের ঠাণ্ডা থেকে রেহাই দেয়ার জন্য গরম কাপড় পরানাে হত।

এ হলাে বিমান আবিষ্কার ও উড্ডয়নের প্রারম্ভিক ঘটনা।